সাধু ভাষা কি বা কাকে বলে? সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য

Rate this post

আজকের এই প্রবন্ধটি থেকে আপনি জানতে পারবেন সাধু ভাষা কি বা কাকে বলে ? সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য। নিচে বিষয়টি উদাহরণসহ বিস্তার ভাবে আলোচনা করা হলো।

সাধু ভাষা

সংজ্ঞা:

সাধু ভাষা হলো বাংলা ভাষার একটি আভিধানিক ও ব্যাকরণিক রীতি। এটি সংস্কৃত ভাষার প্রভাবাধীন এবং তৎসম শব্দের ব্যবহারে প্রাধান্য পায়। সাধু ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, আইন, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

বৈশিষ্ট্য:

  • তৎসম শব্দের ব্যবহার বেশি।
  • সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার দীর্ঘায়িত রূপ ব্যবহৃত হয়।
  • সর্বনাম পদের পূর্ণরূপ ব্যবহার করা হয়।
  • বাক্যের গঠন ও শব্দের বিন্যাস কিছুটা জটিল।

উদাহরণ:

  • সাধু ভাষা:
    • “আমি বিদ্যালয়ে যাইতেছি।”
    • “সে আমাকে একটি বই দিল।”
    • “আমরা সকলে একসাথে খেলিয়াছিলাম।”

চলিত ভাষা

সংজ্ঞা:

চলিত ভাষা হলো বাংলা ভাষার একটি প্রাকৃতিক রীতি। এটি সাধারণ মানুষের কথাবার্তায় ব্যবহৃত হয়। চলিত ভাষায় তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার বেশি।

বৈশিষ্ট্য:

  • তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার বেশি।
  • সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয়।
  • সর্বনাম পদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা হয়।
  • বাক্যের গঠন ও শব্দের বিন্যাস সহজ।

উদাহরণ:

  • চলিত ভাষা:
    • “আমি স্কুলে যাচ্ছি।”
    • “সে আমাকে একটা বই দিল।”
    • “আমরা সবাই একসাথে খেলেছিলাম।”

সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য

সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। নিচে সেগুলি তুলে ধরা হলো:

বিষয় সাধু ভাষা চলিত ভাষা
শব্দের উৎপত্তি তৎসম শব্দের প্রাধান্য তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের সমন্বয়
ক্রিয়ার রূপ সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার দীর্ঘায়িত রূপ সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ
সর্বনাম পদের রূপ পূর্ণরূপ সংক্ষিপ্ত রূপ
বাক্যের গঠন জটিল সহজ

সাধু ও চলিত ভাষার রুপান্তর

সাধু ভাষাকে চলিত ভাষায় রূপান্তর করা কঠিন নয়। তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে তা সহজতর হয়। নিচে সাধু ভাষাকে চলিত ভাষায় রূপান্তরের কিছু নিয়ম দেওয়া হলো:

  • তৎসম শব্দের পরিবর্তে তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ ব্যবহার করা।
  • সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার দীর্ঘায়িত রূপের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা।
  • সর্বনাম পদের পূর্ণরূপের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা।
  • বাক্যের গঠনকে সহজতর করা।

উদাহরণ:

  • সাধু ভাষা: “আমি বিদ্যালয়ে যাইতেছি।”

  • চলিত ভাষা: “আমি স্কুলে যাচ্ছি।”

  • সাধু ভাষা: “সে আমাকে একটি বই দিল।”

  • চলিত ভাষা: “সে আমাকে একটা বই দিল।”

  • সাধু ভাষা: “আমরা সকলে একসাথে খেলিয়াছিলাম।”

  • চলিত ভাষা: “আমরা সবাই একসাথে খেলেছিলাম।”

সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য জেনে ও নিয়ম মেনে চললে যেকোনো সাধু ভাষাকে চলিত ভাষায় রূপান্তর করা সম্ভব।

সাধু ও চলিত ভাষার ভূমিকা

সাধু ও চলিত ভাষা বাংলা ভাষার দুটি প্রধান রীতি। এগুলির প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকা রয়েছে।

সাধু ভাষার ভূমিকা:

  • সাধু ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, আইন, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
  • সাধু ভাষার মাধ্যমে বাংলা ভাষার শালীন ও সুশৃঙ্খল রূপ প্রকাশ পায়।
  • সাধু ভাষার মাধ্যমে বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখা যায়।

চলিত ভাষার ভূমিকা:

  • চলিত ভাষা সাধারণ মানুষের কথাবার্তায় ব্যবহৃত হয়।
  • চলিত ভাষার মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রাকৃতিক ও সরল রূপ প্রকাশ পায়।
  • চলিত ভাষার মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকাশ ও প্রসার ঘটে।

সাধু ও চলিত ভাষার ব্যবহার

সাধু ও চলিত ভাষার ব্যবহার নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর। যেসব ক্ষেত্রে শালীন ও সুশৃঙ্খল ভাষার প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে সাধু ভাষা ব্যবহার করা হয়। যেমন, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, আইন, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে। আর যেসব ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কথাবার্তায় ব্যবহারের প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে চলিত ভাষা ব্যবহার করা হয়। যেমন, দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণমাধ্যম ইত্যাদি ক্ষেত্রে।

সাধু ও চলিত ভাষার সমন্বয়

সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও এগুলির মধ্যে সমন্বয়ও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধু ও চলিত ভাষার শব্দ, বাক্যাংশ ও রীতি একইভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, “আমি যাইতেছি” (সাধু) ও “আমি যাচ্ছি” (চলিত)। এক্ষেত্রে উভয় রীতিই গ্রহণযোগ্য।

সাধু ও চলিত ভাষার সংমিশ্রণ

সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও এগুলির মধ্যে সংমিশ্রণও লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে, সাহিত্যে সাধু ও চলিত ভাষার সংমিশ্রণ বেশি দেখা যায়। সাধু ভাষার শালীনতা ও চলিত ভাষার সরলতা একত্রিত করে সাহিত্যিকরা তাদের রচনাকে আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলেন।

সাধু ও চলিত ভাষার সংমিশ্রণে নিম্নলিখিত নিয়মগুলি প্রয়োগ করা হয়:

  • শব্দের উৎপত্তি: সাধু ভাষার তৎসম শব্দের পাশাপাশি চলিত ভাষার তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার করা হয়।
  • ক্রিয়ার রূপ: সাধু ভাষার সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার দীর্ঘায়িত রূপের পাশাপাশি চলিত ভাষার সংক্ষিপ্ত রূপের ব্যবহার করা হয়।
  • সর্বনাম পদের রূপ: সাধু ভাষার পূর্ণরূপের পাশাপাশি চলিত ভাষার সংক্ষিপ্ত রূপের ব্যবহার করা হয়।
  • বাক্যের গঠন: সাধু ভাষার জটিল বাক্যের গঠনকে চলিত ভাষার সহজ বাক্যের গঠনে রূপান্তর করা হয়।

সাধু ও চলিত ভাষার সংমিশ্রণের মাধ্যমে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। এটি বাংলা ভাষাকে আরও আধুনিক ও সাবলীল করে তোলে।

সাধু ও চলিত ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু টিপস:

  • সাধু ভাষা:

    • সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, আইন, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাধু ভাষা ব্যবহার করা উচিত।
    • সাধু ভাষার শব্দ, বাক্যাংশ ও রীতি যথাযথভাবে ব্যবহার করা উচিত।
    • সাধু ভাষার মাধ্যমে বাংলা ভাষার শালীনতা ও সুশৃঙ্খল রূপ প্রকাশ করা উচিত।
  • চলিত ভাষা:

    • দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণমাধ্যম ইত্যাদি ক্ষেত্রে চলিত ভাষা ব্যবহার করা উচিত।
    • চলিত ভাষার শব্দ, বাক্যাংশ ও রীতি যথাযথভাবে ব্যবহার করা উচিত।
    • চলিত ভাষার মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রাকৃতিক ও সরল রূপ প্রকাশ করা উচিত।

সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে বাংলা ভাষাকে আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

সাধু ও চলিত ভাষার বিবর্তন

বাংলা ভাষার বিবর্তনে সাধু ও চলিত ভাষার প্রত্যেকটিরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাধু ভাষা বাংলা ভাষার প্রাচীন রীতি, যা সংস্কৃত ভাষার প্রভাবাধীন। চলিত ভাষা বাংলা ভাষার আধুনিক রীতি, যা সাধারণ মানুষের কথাবার্তা থেকে উদ্ভূত।

সাধু ভাষার বিবর্তন:

  • প্রাচীন বাংলায় সাধু ভাষার প্রাধান্য ছিল।
  • মধ্যযুগে সাধু ভাষার পাশাপাশি চলিত ভাষার বিকাশ ঘটতে থাকে।
  • আধুনিক যুগে সাধু ভাষার ব্যবহার কিছুটা হ্রাস পায় এবং চলিত ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

চলিত ভাষার বিবর্তন:

  • মধ্যযুগে চলিত ভাষার বিকাশ ঘটে।
  • আধুনিক যুগে চলিত ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং সাধু ভাষার পাশাপাশি একটি সমৃদ্ধ রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাধু ও চলিত ভাষার বিবর্তনের ফলে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বাংলা ভাষাকে আরও আধুনিক ও সাবলীল করে তুলেছে।

সাধু ও চলিত ভাষার ভবিষ্যৎ

সাধু ও চলিত ভাষা বাংলা ভাষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি। এগুলির প্রত্যেকটিরই নিজস্ব ভূমিকা ও গুরুত্ব রয়েছে।

সাধু ভাষা বাংলা ভাষার শালীনতা ও সুশৃঙ্খল রূপের প্রতীক। এটি বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চলিত ভাষা বাংলা ভাষার প্রাকৃতিক ও সরল রূপের প্রতীক। এটি বাংলা ভাষার বিকাশ ও প্রসার ঘটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করে বাংলা ভাষাকে আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। ভবিষ্যতেও সাধু ও চলিত ভাষা বাংলা ভাষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি হিসেবে বিরাজ করবে বলে আশা করা যায়।

ভালো লাগলে পোস্টটিও দেখুন: অব্যয় পদ কাকে বলে ও কত প্রকার?

সাধু ও চলিত ভাষার কিছু উদাহরণ

সাধু ভাষা চলিত ভাষা
আমি বিদ্যালয়ে যাইতেছি। আমি স্কুলে যাচ্ছি।
সে আমাকে একটি বই দিল। সে আমাকে একটা বই দিল।
আমরা সকলে একসাথে খেলিয়াছিলাম। আমরা সবাই একসাথে খেলেছিলাম।

সাধু ভাষার কিছু বাক্যাংশ

  • সাধু রীতিতে লিখিত।
  • সাধু ভাষার ব্যবহার।
  • সাধু ভাষায় অনুবাদ।

চলিত ভাষার কিছু বাক্যাংশ

  • চলিত রীতিতে লিখিত।
  • চলিত ভাষার ব্যবহার।
  • চলিত ভাষায় অনুবাদ।

সাধু ও চলিত ভাষার কিছু শব্দ

সাধু ভাষা চলিত ভাষা
বিদ্যালয় স্কুল
অনুগ্রহ করে দয়া করে
অতএব সুতরাং
অপরপক্ষে অন্যদিকে
আদ্যিকথায় প্রথমত
অন্ততপক্ষে অন্তত
অবশ্যই অবশ্যই
অতিরিক্ত বেশি
অল্পস্বল্প একটু একটু
অবশ্যই অবশ্যই
অবশ্যই অবশ্যই

সাধু ও চলিত ভাষার কিছু ক্রিয়ার রূপ

সাধু ভাষা চলিত ভাষা
যাইতেছি যাচ্ছি
দিল দিল
খেলিয়াছিলাম খেলেছিলাম

সাধু ও চলিত ভাষার কিছু সর্বনাম পদের রূপ

সাধু ভাষা চলিত ভাষা
আমি আমি
তুমি তুমি
সে সে
আমরা আমরা
আপনি আপনি
তারা তারা

আশা করি এই আর্টিকেলটি থেকে আপনি সাধু ও চলিত ভাষা সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।

উপসংহার

সাধু ও চলিত ভাষা বাংলা ভাষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি। এগুলির প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকা রয়েছে। সাধু ও চলিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য জেনে ও সমন্বয় রক্ষা করে বাংলা ভাষাকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

Leave a Comment