সনেট কাকে বলে? সনেট কত প্রকার? প্রবর্তক কে

Rate this post

আজকের পোস্টটিতে আলোচনা করা হয়েছে সনেট কাকে বলে? সনেট কত প্রকার? প্রবর্তক কে এই বিষয়টি নিয়ে।

সনেট কাকে বলে?

সনেট হল এক ধরনের কাব্যিক রূপ যা মধ্যযুগে ইতালিতে উদ্ভূত হয়েছিল। এটি ১৪টি চরণে বিন্যস্ত একটি কবিতা। প্রতিটি চরণে সাধারণভাবে মোট ১৪টি করে অক্ষর থাকে। সনেটের প্রথম আট চরণের স্তবককে অষ্টক এবং পরবর্তী ছয় চরণের স্তবককে ষটক বলে। অষ্টকে মূলত ভাবের প্রবর্তনা এবং ষটকে ভাবের পরিণতি থাকে, যাকে বলা হয় ভোল্টা।

সনেট কত প্রকার?

সনেট প্রধানত তিন প্রকার:

  • ইতালীয় সনেট: এটি ইতালিতে উদ্ভূত হয়েছিল। এতে অষ্টক ও ষটকের ছন্দক্রম হলো abbabbacdcdcd।
  • শেক্সপিয়ার সনেট: এটি ইংল্যান্ডে উদ্ভূত হয়েছিল। এতে অষ্টক ও ষটকের ছন্দক্রম হলো ababcdcdcd efefgg。
  • ফরাসি সনেট: এটি ফ্রান্সে উদ্ভূত হয়েছিল। এতে অষ্টক ও ষটকের ছন্দক্রম হলো abab cdcd efef gg।

এছাড়াও, সনেটকে বিভিন্ন উপায়ে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। যেমন, বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে সনেটকে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়:

  • প্রেমের সনেট: এতে প্রেমের অনুভূতি প্রকাশ করা হয়।
  • ধর্মীয় সনেট: এতে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ করা হয়।
  • নাগরিক সনেট: এতে নাগরিক বিষয়বস্তুর প্রতিফলন ঘটে।
  • প্রকৃতি সনেট: এতে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মহিমাকে তুলে ধরা হয়।

সনেট প্রবর্তক কে?

সনেট প্রবর্তক হিসেবে ইতালির কবি পেত্রার্কের (১৩০৪-১৩৭৪) নাম সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। তিনি ইতালিতে সনেটকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তার রচিত “সনেটস টু লাura” বিশ্বসাহিত্যের অমর কীর্তি।

বাংলা ভাষায় সনেটের জনক হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। তিনি ১৮৬৫ সালে ফ্রান্সে অবস্থানকালে ইতালির কবি পেত্রার্কের সনেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেন। তার রচিত “চতুর্দশপদী” বাংলা ভাষায় সনেটের অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।

সনেট কাব্যের গুরুত্ব

সনেট কাব্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কাব্যিক ভাষার শৈল্পিকতার পরিচয় বহন করে। সনেট কাব্যের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষক প্রকাশ সম্ভব।

সনেট কাব্যের মাধ্যমে কাব্যিক ভাষার শৈল্পিকতা ও ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা উন্নত করা যায়। এছাড়াও, সনেট কাব্যের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষক প্রকাশের দক্ষতা অর্জন করা যায়।

সনেট কাব্যের গুরুত্ব নিম্নরূপ:

  • কাব্যিক ভাষার শৈল্পিকতা: সনেট কাব্যের মাধ্যমে কাব্যিক ভাষার শৈল্পিকতা বিকশিত হয়। সনেট কাব্যে শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ও প্রকাশভঙ্গি অত্যন্ত মনোরম ও চিত্তাকর্ষক হয়। এতে শব্দের অন্ত্যমিল, ছন্দের ছন্দবদ্ধতা, শব্দের অর্থের ভাবগাম্ভীর্য প্রভৃতি কাব্যিক ভাষার শৈল্পিকতাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

  • ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা: সনেট কাব্যের মাধ্যমে ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা উন্নত হয়। সনেট কাব্যের সীমিত আয়তনে ভাব প্রকাশের জন্য কবিদেরকে সৃজনশীল হতে হয়। এতে কবিদের ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা বিকশিত হয়।

  • বিষয়বস্তুর মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষক প্রকাশ: সনেট কাব্যের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষক প্রকাশ সম্ভব। সনেট কাব্যের সীমিত আয়তনে ভাব প্রকাশের জন্য কবিদেরকে বিষয়বস্তুর মূল ভাবটিকে স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করতে হয়। এতে বিষয়বস্তুটি আরও মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে।

সনেট কাব্যের গুরুত্বের আলোকে বলা যায় যে, এটি একটি অত্যন্ত শৈল্পিক ও মনোরম কাব্যিক রূপ। এটি বিভিন্ন বিষয়বস্তুকে মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষকভাবে প্রকাশের জন্য একটি আদর্শ মাধ্যম।

সনেট কাব্যের কাঠামো

সনেট কাব্যের কাঠামো নিম্নরূপ:

  • অষ্টক: সনেটের প্রথম আট চরণের স্তবককে অষ্টক বলে। অষ্টকে মূলত ভাবের প্রবর্তনা হয়।
  • ষটক: সনেটের পরবর্তী ছয় চরণের স্তবককে ষটক বলে। ষটকে ভাবের পরিণতি থাকে, যাকে বলা হয় ভোল্টা।

অষ্টক ও ষটকের ছন্দক্রম বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। ইতালীয় সনেটে অষ্টক ও ষটকের ছন্দক্রম হলো abbabbacdcdcd। শেক্সপিয়ার সনেটে অষ্টক ও ষটকের ছন্দক্রম হলো ababcdcdcd efefgg। ফরাসি সনেটে অষ্টক ও ষটকের ছন্দক্রম হলো abab cdcd efef gg।

সনেট কাব্যের ছন্দ

সনেট কাব্যের ছন্দ সাধারণত ঐকতান ছন্দ বা মুক্ত ছন্দের হয়। ঐকতান ছন্দে প্রতিটি চরণে নির্দিষ্ট অক্ষরের সংখ্যা ও ছন্দের ধ্বনি থাকে। মুক্ত ছন্দে প্রতিটি চরণের অক্ষরের সংখ্যা ও ছন্দের ধ্বনি নির্দিষ্ট থাকে না।

সনেট কাব্যের ভাষা

সনেট কাব্যের ভাষা সাধারণত শৈল্পিক ও সংস্কৃতিমনা। এতে শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ও প্রকাশভঙ্গি অত্যন্ত মনোরম ও চিত্তাকর্ষক হয়।

সনেট কাব্যের বিষয়বস্তু

সনেট কাব্যের বিষয়বস্তু বিভিন্ন রকম হতে পারে। প্রেম, প্রকৃতি, ধর্ম, দেশপ্রেম, মানবতাবাদ প্রভৃতি বিষয় সনেটে ব্যবহৃত হয়।

সনেট কাব্যের উদাহরণ

ইতালীয় কবি পেত্রার্কের “সনেটস টু লাura” বিশ্বসাহিত্যের অমর কীর্তি। এতে প্রেমের অনুভূতি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলা ভাষায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের “চতুর্দশপদী” বাংলা ভাষায় সনেটের অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। এতে প্রেম, প্রকৃতি, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়ের প্রতিফলন ঘটেছে।

সনেট কাব্যের ইতিহাস

সনেট কাব্যের ইতিহাস মধ্যযুগে ইতালিতে শুরু হয়। ইতালির কবি পেত্রার্ক (১৩০৪-১৩৭৪) সনেট কাব্যের প্রবর্তক হিসেবে বিবেচিত হন। তার রচিত “সনেটস টু লাura” বিশ্বসাহিত্যের অমর কীর্তি।

পেত্রার্কের পর ইতালিতে সনেট কাব্যের বিকাশ ঘটে। ইতালির অন্যতম বিখ্যাত কবি ফ্রান্সেস্কো পেট্রারকাও (১৩০৪-১৩৭৪) সনেট রচনা করেন। তার রচিত “সনেটস টু লাura” পেত্রার্কের সনেটস টু লাura-র অনুসরণে রচিত হয়েছিল।

ইতালিতে সনেট কাব্যের বিকাশের পর ইংল্যান্ডে সনেট কাব্যের প্রসার ঘটে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬) সনেট কাব্যের অন্যতম পথিকৃৎ। তার রচিত “সনেটস” ইংরেজি সাহিত্যের অমর কীর্তি।

শেক্সপিয়ারের পর ইংল্যান্ডে সনেট কাব্যের বিকাশ ঘটে। ইংল্যান্ডের অন্যতম বিখ্যাত কবি জন ডন (১৫৭২-১৬৩১) সনেট রচনা করেন। তার রচিত “সনেটস” শেক্সপিয়ারের সনেটস-এর অনুসরণে রচিত হয়েছিল।

ইতালিতে সনেট কাব্যের বিকাশের পর ফ্রান্সে সনেট কাব্যের প্রসার ঘটে। ফ্রান্সের বিখ্যাত কবি ফ্রান্সোই ভিয়োলেট-লে-ডু (১৫৩৩-১৫৯৬) সনেট কাব্যের অন্যতম পথিকৃৎ। তার রচিত “সনেটস” ফরাসি সাহিত্যের অমর কীর্তি।

ভিয়োলেট-লে-ডুর পর ফ্রান্সে সনেট কাব্যের বিকাশ ঘটে। ফ্রান্সের অন্যতম বিখ্যাত কবি পিয়ের দ্য রঁসার (১৫৮৬-১৬৩১) সনেট রচনা করেন। তার রচিত “সনেটস” ভিয়োলেট-লে-ডুর সনেটস-এর অনুসরণে রচিত হয়েছিল।

ইতালিতে সনেট কাব্যের বিকাশের পর স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, রাশিয়া প্রভৃতি দেশেও সনেট কাব্যের প্রসার ঘটে।

বাংলা ভাষায় সনেট কাব্যের প্রবর্তক হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। তিনি ১৮৬৫ সালে ফ্রান্সে অবস্থানকালে ইতালির কবি পেত্রার্কের সনেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেন। তার রচিত “চতুর্দশপদী” বাংলা ভাষায় সনেটের অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।

মধুসূদন দত্তের পর বাংলা ভাষায় সনেট কাব্যের বিকাশ ঘটে। বাংলা ভাষায় সনেট রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, তিরুনীলকান্তি মুখোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ কবি।

সনেট কাব্যের ভবিষ্যৎ

সনেট কাব্য একটি চিরন্তন কাব্যিক রূপ। এটি বিভিন্ন বিষয়বস্তুকে মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষকভাবে প্রকাশের জন্য একটি আদর্শ মাধ্যম। তাই সনেট কাব্যের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

সনেট কাব্যের প্রয়োজনীয়তা

সনেট কাব্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এটি কাব্যিক ভাষার শৈল্পিকতার পরিচয় বহন করে। সনেট কাব্যের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষক প্রকাশ সম্ভব।

আমাদের অন্য একটি পোস্ট করুন: কবিতা কি বা কাকে বলে?

উপসংহার

সনেট কাব্য একটি অত্যন্ত শৈল্পিক ও মনোরম কাব্যিক রূপ। এটি বিভিন্ন বিষয়বস্তুকে মর্মস্পর্শী ও চিত্তাকর্ষকভাবে প্রকাশের জন্য একটি আদর্শ মাধ্যম।

Leave a Comment