জলবায়ু কাকে বলে? জলবায়ুর উপাদানসমূহ?

Rate this post

এই প্রবন্ধ থেকে জানতে পারবেন জলবায়ু কাকে বলে? জলবায়ুর উপাদানসমূহ? নিচে বিষয়টি নিয়ে বিস্তার বা আলোচনা করা হলো।

জলবায়ু কাকে বলে?

কোন স্থানের দীর্ঘদিনের আবহাওয়ার গড়কে জলবায়ু বলে। সাধারণত ৩০-৩৫ বছরের আবহাওয়ার গড়কে জলবায়ু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান, যেমন তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, মেঘলা আকাশ, সূর্যের আলো, ইত্যাদির গড়কে বিবেচনা করে জলবায়ু নির্ণয় করা হয়।

জলবায়ুর উপাদানসমূহ

জলবায়ুর প্রধান উপাদানসমূহ হল:

  • তাপমাত্রা: কোন স্থানের বাতাসের গড় তাপমাত্রাকে তাপমাত্রা বলে। তাপমাত্রা জলবায়ুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
  • বায়ুচাপ: বায়ুর প্রতি একক ক্ষেত্রফলের ওপর যে বল ক্রিয়া করে তাকে বায়ুচাপ বলে। বায়ুচাপ জলবায়ুর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
  • আর্দ্রতা: বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণকে আর্দ্রতা বলে। আর্দ্রতা জলবায়ুর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
  • বৃষ্টিপাত: বায়ুমণ্ডল থেকে ভূপৃষ্ঠে জল পড়ার ঘটনাকে বৃষ্টিপাত বলে। বৃষ্টিপাত জলবায়ুর চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
  • মেঘলা আকাশ: বায়ুমণ্ডলে মেঘের পরিমাণকে মেঘলা আকাশ বলে। মেঘলা আকাশ জলবায়ুর পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
  • সূর্যের আলো: সূর্য থেকে পৃথিবীতে আগত আলোর পরিমাণকে সূর্যের আলো বলে। সূর্যের আলো জলবায়ুর ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

জলবায়ুর প্রভাব

জলবায়ু মানুষের জীবন ও পরিবেশের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। জলবায়ুর প্রভাবের মধ্যে রয়েছে:

  • কৃষি: জলবায়ুর প্রভাব কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, ইত্যাদির তারতম্যের কারণে ফসলের ফলন কমতে বা বাড়তে পারে।
  • শিল্প: জলবায়ুর প্রভাব শিল্প উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা, ইত্যাদির তারতম্যের কারণে শিল্প উৎপাদন কমতে বা বাড়তে পারে।
  • পরিবেশ: জলবায়ুর প্রভাব পরিবেশের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়, বরফ গলে যায়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পরিবর্তিত হয়, ইত্যাদি।

জলবায়ু পরিবর্তন

মানুষের কার্যকলাপের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বন উজাড়, ইত্যাদি কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর অন্যান্য উপাদান, যেমন বৃষ্টিপাত, বরফ গলন, ইত্যাদির তারতম্য হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে যেসব বিরূপ প্রভাব পড়ছে তার মধ্যে রয়েছে:

  • উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উৎপাদন হ্রাস: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময়সূচী পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদির কারণে ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
  • ফসল উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ফসল উৎপাদনে সেচ, সার, কীটনাশক ইত্যাদির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • ফসলের নতুন জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতির প্রয়োজন: জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন ফসলের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতির প্রয়োজন হবে।
  • খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশের কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

  • জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা মূল্যায়ন: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে যেসব ঝুঁকি ও সম্ভাবনা রয়েছে তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
  • জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও প্রশমন কৌশল গ্রহণ: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় অভিযোজন ও প্রশমন কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।
  • কৃষি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন ফসলের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতির উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
  • কৃষি খাতের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন: কৃষি খাতের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা হলে কৃষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কর্মসূচি (নিউইসিসিএপি): ২০১০ সালে সরকার নিউইসিসিএপি গ্রহণ করে। এই কর্মসূচির আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
  • জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন কর্মসূচি (নিউসিসিপিএম): ২০১২ সালে সরকার নিউসিসিপিএম গ্রহণ করে। এই কর্মসূচির আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
  • কৃষি জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কর্মসূচি (এগ্রিকালচারাল সিসিএপি): ২০১৫ সালে সরকার এগ্রিকালচারাল সিসিএপি গ্রহণ করে। এই কর্মসূচির আওতায় কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও জনগণের অংশগ্রহণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

আমাদের এই পোস্টটি পড়ে দেখতে পারেন: শিলা কাকে বলে?

কৃষি জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কর্মসূচি (এগ্রিকালচারাল সিসিএপি)

বাংলাদেশ সরকারের কৃষি জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কর্মসূচি (এগ্রিকালচারাল সিসিএপি) ২০১৫ সালে গ্রহণ করা হয়। এই কর্মসূচির আওতায় কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

এগ্রিকালচারাল সিসিএপি-এর লক্ষ্য হল:

  • জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা: কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব ঝুঁকি ও সম্ভাবনা রয়েছে তা মূল্যায়ন করা।
  • জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা।
  • কৃষি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা: জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন ফসলের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতির উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা।
  • কৃষি খাতের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা: কৃষি খাতের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা হলে কৃষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম হবে।

এগ্রিকালচারাল সিসিএপি-এর আওতায় নিম্নলিখিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে:

  • জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা মূল্যায়ন: কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা মূল্যায়নের জন্য জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হচ্ছে।
  • জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল গ্রহণ: জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল গ্রহণের জন্য কৃষি খাতের বিভিন্ন অংশীদারদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ করা হচ্ছে।
  • কৃষি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন ফসলের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতির উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
  • কৃষি খাতের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন: কৃষি খাতের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা, বীমা সুবিধা, ইত্যাদি প্রদান করা হচ্ছে।

এগ্রিকালচারাল সিসিএপি-এর মাধ্যমে কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি খাত ও জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি।

কৃষকরা কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করতে পারেন

কৃষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে পারেন:

  • নতুন ফসলের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণ করা: জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন ফসলের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন ফসলের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।
  • সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময়সূচী পরিবর্তন হচ্ছে। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়।
  • জৈব সার ব্যবহার করা: জৈব সার ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যায়। এতে ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায় এবং মাটিতে জল ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
  • বনায়ন করা: বনায়ন করে মাটির ক্ষয় রোধ করা যায়

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মোকাবেলায় জনগণের ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় জনগণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে:

  • সচেতনতা বৃদ্ধি করা: জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। জনগণকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ, প্রভাব ও মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে।
  • ব্যক্তিগত পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা: জনগণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমন, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা, জ্বালানি বিকল্প ব্যবহার করা, পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করা, ইত্যাদি।
  • সরকারের সাথে সহযোগিতা করা: জনগণ সরকারের সাথে সহযোগিতা করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে। যেমন, সরকারের প্রচারণায় অংশগ্রহণ করা, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আইনকানুন মেনে চলা, ইত্যাদি।

জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটি মোকাবেলায় সরকার, বেসরকারি খাত ও জনগণের একসাথে কাজ করা জরুরি।

Leave a Comment